ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুড়িগ্রামে মহামারী আকার ধারণ করছে গবাদি পশুর লাম্পি ও খুরারোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৬-১৫ ২৩:৫৮:৪৮
কুড়িগ্রামে মহামারী আকার ধারণ করছে গবাদি পশুর লাম্পি ও খুরারোগ কুড়িগ্রামে মহামারী আকার ধারণ করছে গবাদি পশুর লাম্পি ও খুরারোগ
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ও খুরারোগ। গত ১৫ দিনে এসব রোগে শতাধিক গরুর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন খামারি ও স্থানীয়রা। আক্রান্ত হয়েছে সহস্রাধিক গবাদি পশু।

একের পর এক গরু মারা যাওয়ায় অন্তত ২০টি মিনি খামার কার্যত ধ্বংসের মুখে পড়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পর্যাপ্ত সেবা না পাওয়ার অভিযোগে ক্ষুব্ধ খামারি ও কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, আক্রান্ত গরুর চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসক বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা গ্রাম্য চিকিৎসক ও কবিরাজদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। এতে অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসার কারণে গরুর মৃত্যুও বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

আতঙ্কে অনেকে লোকসান গুনে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের কাসারির ঘাট, কদমতলা, মালচারপাড়, চরেরপাড় ও নীলকণ্ঠ; বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সাতভিটা, হাপারভিটা, দোলন ও জলঙ্গার কুঠি; ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ মধুপুর ও মাদারটারী এবং ধামশ্রেণী ইউনিয়নের কাশিয়াগাড়ী, নাওড়া, খাওনার দরগা ও ইন্দারারপাড় গ্রামে রোগটির ব্যাপক বিস্তার দেখা গেছে।

এসব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একাধিক গরু লাম্পি রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত গরুর শরীরজুড়ে বড় বড় গুটি, ঘা, জ্বর, দুর্বলতা ও ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খুরারোগ একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী ইউনিয়নের খাওনার দরগা গ্রামে এক খামারেই মারা গেছে পাঁচ গরু। খামারি মোঃ জামাল উদ্দিন জানান, তাঁর মিনি খামারের ১৬টি গরুর মধ্যে পাঁচটি লাম্পিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

যার বাজারমূল্য ছয় লাখ টাকার বেশি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘উলিপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করলে কোনো ডাক্তার আসেননি। প্রফুল্ল নামে এক কর্মচারী এসে ভ্যাকসিন দিয়ে ৩ হাজার ২০০ টাকা নিয়েছেন। এরপরও গরুগুলো বাঁচানো যায়নি।’ সুরিরডারা গ্রামের খামারি মোঃ মোস্তা মিয়ার আটটি গরুর মধ্যে একটি বাছুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। তিনি বলেন, ‘গরুর সারা শরীরে ঘা হয়েছে, পোকা ধরেছে। ১০ দিন ধরে কষ্ট পাচ্ছে। অফিসে গিয়ে ৫০০ টাকা জমা দিয়েছি।

ডাক্তার না এসে একজন কর্মচারী এসে ভ্যাকসিন দিয়ে গেছে। তেল খরচের নামে আরও ২০০ টাকা নিয়েছে। ডাক্তারকে ভিজিট দেওয়ার কথাও বলেছি, তবু কেউ আসেনি। চোখের সামনে গরুটা ধুঁকে ধুঁকে মরছে।’ স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, কদমতলা গ্রামের মোঃ করিম উদ্দিন, মোঃ মুকুল মিয়া, মোঃ কছিম উদ্দিন ও মোঃ সাহাবুদ্দিন; কাশিয়াগাড়ী গ্রামের মোঃ শফি কামাল; ভদ্রপাড়া গ্রামের মোঃ রয়েল মিয়া এবং কুড়ারপাড় গ্রামের মোঃ একরামুল হকসহ অনেক খামারির গরু মারা গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, গত দুই সপ্তাহে কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক গরু মারা গেছে এবং আক্রান্ত হয়েছে সহস্রাধিক গবাদি পশু। আতঙ্কে গরু বিক্রি করছেন খামারিরা। উলিপুর আদর্শ কেন্দ্রীয় দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমার খামারও আক্রান্ত হয়েছিল। আতঙ্কে চারটি গাভি রেখে বাকি গরুগুলো বিক্রি করে দিয়েছি। গরুগুলো একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু প্রাণিসম্পদ বিভাগের তৎপরতা চোখে পড়ছে না।’

গ্রাম্য পশু চিকিৎসক মোঃ বাদল মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা করছি। শুধু লাম্পি নয়, খুরারোগও ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চিকিৎসা না দিলে গরুর মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়ত।’ তবে স্থানীয় অনেক খামারির অভিযোগ, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা রোগের বিস্তার ও মৃত্যুহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের দাবি, লাম্পি ও খুরারোগ নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন সরবরাহ, চিকিৎসক টিম গঠন এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হোক। তা না হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উলিপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মোছাঃ রেবেকা বেগম বলেন, ‘লাম্পি বর্তমানে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কিছু গরুর মৃত্যুর খবরও পেয়েছি। দীর্ঘদিন ভ্যাকসিনের সংকট ছিল। আমাদের জনবলও খুব সীমিত।’ তিনি বলেন, ‘১৪টি ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই। ড্রাইভারও নেই। মাত্র দুজন জনবল নিয়ে পুরো উপজেলা সামলাতে হচ্ছে।

অনেক সময় খামারিরাও ভ্যাকসিন নিতে আগ্রহ দেখান না। তবে এখন উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে এবং ভ্যাকসিন কার্যক্রমও চালু রয়েছে।’

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ